ফজরে আমি উঠতে পারি না
ভোরবেলা ঘুম থেকে জাগতে পারি না আমি। মাঝেমধ্যে জেগে উঠলেও আলসেমিতে পেয়ে বসে। আড়মোড়া ভেঙ্গে আরেকদিকে কাত হয়ে শুয়ে যাই। ফজরের জামা‘আতে শামিল হতে পারি না। সুবহে সাদিকের সুনির্মল হাওয়া আমার গায়ে ঝিরিঝিরি পরশ বুলানোর সুযোগ পায় না। পবিত্রতার সতেজতম আবহ আমাকে স্পর্শ করে না। বিশুদ্ধ বাতাসে বুক ভরে নিঃশ্বাস নেওয়ার অনুভূতি থেকে আমি বঞ্চিত হই প্রতিদিন। আরেকটা চমৎকার জিনিস থেকে আমি বঞ্চিত হই। আসলে ‘বঞ্চিত হই’ বলাটা বাঞ্ছনীয় হবে না, আদতে আমি নিজেকে ‘বঞ্চিত করি’। কোন্ জিনিস থেকে বঞ্চিত হই, সেটা বলছি একটু পরে। তার আগে ছোট্ট একটা গল্পের কথা মনে পড়লো। সত্যি গল্প কিন্তু! আমি খুব ভালো ছাত্র। আমাদের কলেজটাও খুব নাম করা। এই কলেজের একজন কৃতী ছাত্র হলেন আমাদের প্রেসিডেন্ট। অনেক বছর পর তিনি তারুণ্যের স্মৃতিবিজড়িত এই কলেজটাতে এলেন। বার্ষিক পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে তাঁকে আমন্ত্রণ করা হয়েছে। আমি তাঁকে অভিনন্দন জানিয়ে একটা মানপত্র পাঠ করেছিলাম। অনুষ্ঠান শেষে প্রেসিডেন্ট যখন প্রিন্সিপ্যাল স্যারের রুমে, তখন না কি জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘এত চমৎকার বাচনভঙ্গী আর কাব্যিক উপস্থাপনা ছেলেটার! নাম কী ওর?’ প্রিন্সিপ্যাল স্যার বললেন, ‘ও আমাদের একজন মেরিটরিয়াস স্টুডেন্ট- ফাইয়াজ আবদুল্লাহ।’ প্রেসিডেন্ট হেসে বললেন, ‘বাহ! ফাইয়াজ আব্দুল্লাহ- খুব সুন্দর নাম! পড়াশোনা করে কেমন?’ সব স্যার একবাক্যে বললেন, ‘ভেরি পাংচুয়াল অ্যান্ড অ্যাটেন্টিভ।’ ভাইস প্রিন্সিপ্যাল স্যার এই ঘটনা আমাকে পরদিন বললেন। আমি তো নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না! প্রেসিডেন্ট আমার কথা জিজ্ঞেস করেছেন, এ তো আমার এক জীবনের সবচে’ বড়ো পাওয়া! প্রেসিডেন্টের সামনে আমার প্রশংসা করা হবে, স্বপ্নেও কি কখনো ভেবেছিলাম? রোজনামচার খাতায় সেদিনের অনুভূতি লিখে রেখেছিলাম। কালো কালির কলম ছাড়া ইতোপূর্বে অন্য কোনো রঙের কলম দিয়ে আমি রোজনামচা লিখি নি। কিন্তু সেদিনের রোজনামচা-তে পাঁচটা রঙিন কলম ব্যবহার করেছি। বাঁধভাঙ্গা খুশির ঢেউ হৃদয়ের সৈকতে উপচে পড়লে যা হয় আর কি!
এটা আমার জীবনের গল্প। আরেকটা গল্প বলি, যে গল্পটা আবূ হুরায়রা বলেছেন। তিনি আবার বানিয়ে কোনো গল্প বলতেন না! প্রিয় নবীজি (ﷺ) যেভাবে যা বলতেন, তা-ই ঠিক ঠিক আমাদের জন্যে মুখস্থ করে নিতেন। একদিন নবীজি (ﷺ) বলছিলেন:
.يتعاقبون فيكم ملائكة بالليل وملائكة بالنهار ويجتمعون في صلاة الفجر وصلاة العصر ثم يعرج الذين باتوا فيكم فيسألهم ربهم وهو أعلم بهم كيف تركتم عبادي فيقولون تركناهم وهم يصلون وأتيناهم وهم يصلون
.“তোমাদের মধ্যে একদল ফেরেশতা রাতে এবং আরেকদল ফেরেশতা দিনে আসেন, একের পর এক। ফজর ও আসরের সালাতে তাঁরা মিলিত হন। এরপর যাঁরা তোমাদের মধ্যে ছিলেন, তাঁরা উঠে যান। এবার তাঁদের রব্ব তাঁদেরকে জিজ্ঞেস করেন, যদিও তিনি তাদের অবস্থা সম্পর্কে সবচে’ বেশি জানেন, ‘আমার বান্দাহদেরকে কোন্ অবস্থায় রেখে এসেছো?’ তাঁরা বলেন: আমরা তাদের কাছ থেকে যখন চলে আসছিলাম, তখন তারা সালাতে মগ্ন ছিলো। আবার যখন তাদের কাছে এলাম, তখনও তারা সালাত আদায়রত অবস্থায় ছিলো।”
.এই গল্পটা ইমাম বুখারী তাঁর হাদিসের গ্রন্থে এনেছেন। বর্ণনা করেছেন ইমাম মুসলিমও। বোঝা-ই যায়, এই গল্পের বিশুদ্ধতা সন্দেহাতীত!
.আমি ভাবছি ভিন্ন কথা। প্রেসিডেন্টের সামনে সেই যে এক বছর আগে আমার প্রশংসা করা হয়েছিলো, তাতে আমি কেমন উদ্বেল হয়েছিলাম! আচ্ছা, সাময়িক আত্মতৃপ্তি ছাড়া সেই আনন্দানুভূতির আর কোনো আবেদন কি এখন অবশিষ্ট আছে? নেই! কিংবা প্রেসিডেন্টের কি মনে আছে আমার কথা? নেই!
.অন্যদিকে...
আল্লাহ কি ভুলে যান কোনোকিছু? না। আল্লাহর কাছে পেশ করা কোনো রিপোর্ট কি বৃথা যায়? না।
.সেই মানুষগুলো কত না ভাগ্যবান, যাঁদের নামে ফেরেশতারা আল্লাহর কাছে প্রশংসা করেন! সেই আলোকিত মুখগুলো কত না সফল, মাসজিদের সাথে যাঁদের হৃদয় জড়িয়ে থাকে ভালোবাসার বন্ধনে! সেই বন্ধনের সুতো ফেরেশতারা টেনে নিয়ে যান আরশ পর্যন্ত! কেমন সৌভাগ্যবান তাঁরা!
.আমারও তো সুযোগ ছিলো, এঁদের কাতারে নিজেকে শামিল করার। আসরের সালাত তো আমিও আদায় করেছিলাম! মাগরিব সালাতটাও মিস হয় নি, যদিও তাড়াহুড়ো করে গিয়েছি। দুই রাকাত মাসবূক না হয় হোল, ‘ইশা-ও তো আদায় করে এলাম। আলসেমি না করে ফজরটাও যদি আদায় করতাম, তাহলে আমিও আমার প্রিয়তম প্রভূর সামনে প্রশংসিত হতাম।
.আমি আরো ভাবি... এই যে মুয়াজ্জিনের প্রাণস্পর্শী আহ্বান আমাকে প্রাণিত করছে না, ফজরটা হেলায় পার করে দিচ্ছি, এর কারণে শুধু আল্লাহর সামনে প্রশংসিত হওয়া থেকেই যে বঞ্চিত হচ্ছি, তা নয়, এই অবহেলার দরুণ আল্লাহর জিম্মা থেকেও আমি নিজেকে ছাড়িয়ে নিচ্ছি। আমার দিনগুলো যে অস্থিরতায় কাটে, সময়গুলো বিবর্ণ-ধূসর হয়ে যায় হররোজ, এর কারণ কি তাহলে এটাই? আল্লাহর তত্ত্বাবধান যদি আমার ওপর না থাকে, জীবনটা নির্ভার হবে কিভাবে? প্রিয় নবীজি (ﷺ) তো বহু আগেই আমাকে সতর্ক করে দিয়েছিলেন:
.من صلى صلاة الصبح فهو في ذمة الله فلا يطلبنكم الله من ذمته بشيء فإنه من يطلبه من ذمته بشيء يدركه ثم يكبه على وجهه في نار جهنم
.“যে ফজরের সালাত আদায় করলো, সে আল্লাহর তত্ত্বাবধানে চলে এলো। আল্লাহ যেন নিজ তত্ত্বাবধানের কোন কিছু সম্পর্কে তোমাদের বিরুদ্ধে বাদী না হন। কারণ, তিনি যার বিরুদ্ধে আপন তত্ত্বাবধানের কোনো কিছু সম্পর্কে বাদী হবেন, তাকে পাকড়াও করবেন, এরপর তাকে উপুড় করে জাহান্নামের আগুনে নিক্ষেপ করবেন।” [সাহীহ মুসলিম]
.এই হাদিস আমার ভাবনার জগৎটাই এলোমেলো করে দিচ্ছে। কী মোহগ্রস্ততায় আমি নিজেকে নিজে ঠেলে দিচ্ছি অনিশ্চিত অন্ধকারে, জানি না। বিছানার মোলায়েম স্পর্শে সালাতকে ভুলে থেকে আগুনের নির্মম স্পর্শের জন্যে কেন নিজেকে প্রস্তুত করছি তিল তিল করে, জানি না। শুধু জানি, এই আত্মবিধ্বংসী অভ্যাস থেকে আমাকে মুক্ত হতে হবে। হতেই হবে।
এই হাদিস আমার ভেতরে আরেকটি উপলব্ধি জন্ম দিয়েছে আমার অস্থিরতাপূর্ণ আটপৌরে জীবন, বেলা থেকে ঘুম থেকে শুরু হওয়া উদয়স্থ ব্যস্ততা, যেখানে অমানবিক মদদ ছিটিফফট করা হয় নাই, সেই জীবনটাকে আল্লাহর কাছে সমর্পণ করা কি আর কিছু কি চড়াও? আরও কিছু নাকি? মনে হচ্ছে বিশ্বাসী অন্তর আমার জন্য কেন জানানো হচ্ছে প্রেরণা? এই সমরন চমৎকার একটি সড়ী হোল ফজর সালাত তাহলে কেন এই সুযোগ হারাবেন না আমি?
.আমার মানসিক যন্ত্রণা আরো বহুগুণ বৃদ্ধি পায়, যখন জানতে পারলাম, আমাকে তীব্রভাবে নিন্দা করা হয়েছে কুরআনের পাতায়। আমি আধ্যাত্মিকভাবে হযরত আবু হুরায়রা
فخلف من بعدهم خلف أضاعوا الصلاة واتبعوا الشهوات فسوف يلقون غيا
"তাদের পরে এমন সব মন্দলোকেরা স্থলভিযিক্ত হোল, যারা সালাত নষ্ট করলো এবং অনুসরণের অনুসরণ করলো। এরা শিগগীর 'গাই' (জাহান্নামের একটি উপত্যকা) এর মুখোমুখি হ'ল। "[সূরা মারিয়াম: 59]
.কারা সেই দুর্ভাগ্য, যাকে আল্লাহ্ নিজেই 'মন্দ' বলে! এরা তাদের, যারা আমার মত শুভেচ্ছা সময় হয়েছে। বলতে দ্বিধা নেই, চিন্তাভাবনা দেখি, আমি সেই মন্দলোকদের এক হতে যাচ্ছি। আমি সালাতকে অযথ্ন করছি
নিজের খেয়াল-খুশি মত ঘুমিয়ে থাকি, আল্লাহর সামনে দাঁড়াবার জন্য আয়েশী ঘুমের স্বাদ আস্বাদনে প্রবর্তিত হচ্ছি। জাহান্নাম উপত্যকাই কি তবে আমার শেষ ঠিকানা?
আমি কি এতটাই কম? আমি কি এতটা হীন? হ্যাঁ, আমি এতটা নিকৃষ্ট এবং দুর্বল যে, আমার কানে এমনকি নির্গত হয় শয়তানের শ্বর। খতিীব সাহেবের মুখ অনেকবার এ কথা শুনেছি, কিন্তু কথাটা খুব হালকা মনে হয়। বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে সন্দেহ হ'ত যখন আল্লাহর রসূল (ﷺ) কবে থেকে শুনলেন, তখন কি আর সন্দেহের সুযোগ থাকে?
আমাদের কথায় বলা শোনে 'আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (র)
ذكر عند النبي صلى الله عليه وسلم رجل, فقيل: ما زال نائما حتى أصبح, ما قام إلى الصلاة, فقال: (ذاك رجل بال الشيطان في أذنه (
"রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কাছে একজন ব্যক্তি সম্পর্কে আলোচনা হোল। বলা হোল: ভোর হওয়া পর্যন্ত তিনি ঘুমিয়ে ছিলেন, সালাতা দাঁড়ায় নেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: সে এমন লোক, শায়তান যার কানে প্রশিব্বা। [বুখারী, মুসলিম, নাসাঈ এবং ইবন হিব্বান]
এই যে শয়তান এর পিরিবে করা, এটার অর্থ হোল, শায়তান আমার উপর জয়ী হয়েছে আমি যে তার আনুগত্য এবং বশ্যতা, সেই সত্যের স্মারক হোল তার এই প্রশ্রয় গ্রহণ করা হয়। কুলালক ছোটলোকের কারবার আর কী! কিন্তু আমার সঙ্গে কেন এই ছোট্টের সুযোগ তিনি পেলো? কারণ, আমিও তার কথা মেনে নেওয়ার মাধ্যমে তার মত কম হয়ে গেছি।
ছিঃ এ কেমন আমি?
এখানে শেষ না দুনিয়াতে যতবার বিরক্তিকর-প্রকাশক শব্দ আছে, এর মধ্যে একটি অসম্ভাব্য অভিব্যক্তি যদি একটি তালিকা তৈরি হয়, তাহলে নিশ্চিত 'মুনাফিক' শব্দটি প্রথমদিকে থাকবে। চোখ বন্ধ করার জন্য কল্পনা করতে হবে, কেউ আমাকে 'মুনাফিক কোথাকার!' বলবেন, আমার কেমন লাগবে! অথবা আমি যদি কাউকে 'মুনাফিক' বলে সম্বোধন করি, তাহলে কি বিশাল তীব্রতা এবং রাগ তিনি আমার দিকে আসবেন? এর কারণ কি? কারণ হোল, মুনাফিককে একটি ঘৃণ্য চরিত্র, গর্ব করার মত কোন বিষয় নয়।
কিন্তু ... এই 'মুনাফিক' অভিধার তিলক যদি আমি নিজেকে আমার কপালে পরে না, তাহলে কার কি আছে? আবারও আবু হুয়ারারার কাছে গিয়ে তিনি আমাদেরকে শোনা করেছেন আল্লাহর রসূল (ﷺ) এক উক্তি:
ليس صلاة أثقل على المنافق من الفجر والعشاء
"ফজর ও ইশার চেয়ে মুনাফিকদের জন্য কঠিন কোনও সালাত নেই" [বুখারী, মুসলিম, তিরমিযী, ইবনে মাজাহ]
আমি মুনাফিক নই ঠিক আছে, কিন্তু মুনাফিকের মত কাজের কাজটি করলাম ফজরকে ত্যাগ করার মাধ্যমে
হ্যায়, দিন দিন কত নিচে নেমে যাচ্ছে! কত নীচ হয়ে যাচ্ছে! আমি নিজেকে বলি,আমি কি দোষী হবো?
শয়তানের স্রাব প্রস্রবণের স্থান হবার মত নীচ কি আমি?মুনাফিকের মতো ঘৃণিত অভিধায় মুখ করা কি কি খারাপ আমি?আল্লাহর কাছে নিন্দিত হবার মত হঠাৎ হঠাৎ কি কি আমার আছে? সেখানে না। আমি এই নীচ থেকে পরিত্রাণ চান, আমি এই হীনতা থেকে নিজেকে উদ্ধার করতে চান, শয়তানান অনুগমী হওয়ার অভিশাপ থেকে মুক্ত হতে চাই, আমি আমার প্রিয়তম সর্বশক্তিমান আমাকে প্রশংসা করা উচিত.
সিদ্ধান্ত নেন, ফজর সালাত ত্যাগ করা কখনও কখনও ঘুমিয়ে পড়ি কিন্তু আযান পরে আবারো তন্দ্রাচ্ছী হয়ে পড়ি। নবীজী (ﷺ) সাহাবী সামুরা ইবনে জুনদুব (রাঃ) -কে স্বপ্নে দেখেন। তিনি আমার পাশে এসে বসেন। মাথায় হাত রাখা তারপর বললেন, 'তুমি স্বপ্নের মধ্যেই স্বপ্নের গল্প বলি'। আমি তো গল্প পছন্দ করি খুব। সোজাজে বললাম, 'বলুন না প্লিজ!' সে গল্প শুরুর আগে বলেছিল, 'এই যে স্বপ্নটা, এটা কিন্তু স্বপ্নের স্বপ্ন নয়। তুমি যে স্বপ্নের গল্প বলছ, এটা নবীজি (ﷺ) দেখেছি! 'আমি আরও উত্সুক হলাম। সে গল্পটা শোনাতে লাগলো। যখনই বলেন:
أما الذي يثلغ رأسه بالحجر فإنه يأخذ القرآن فيرفضه وينام عن الصلاة المكتوبة
"যে ব্যক্তি মাথার পাথর দিয়ে চুরিকে পরিণত হয়, সে হচ্ছে সে ব্যক্তি, যে কুরআন গ্রহণ করে এবং প্রত্যাখ্যান করে এবং ফরয সালাতকে ঘুমিয়ে থাকে।" [সাহীহ বুখারী]
আমি প্রচণ্ডভাবে ঘুমাতে যাচ্ছি ধর্ষণ এদিকে ফজর সময় প্রায় শেষ হয়ে গেছে তাড়াহুড়ো করে দুই রাকাত ফরয আদায় করে একিল কিন্তু মনটা কি অসুস্থ হয়ে পড়ে কিছুটা স্থির হতে পারছি না কিসের মত শূন্যতাবোধ আমাকে গ্রাস করা হয় এতো জামা'আত না পড়ি না; আবার দুই রাকাত সুন্নাতও বাদ দেনী এই দুই রাকাত সুন্নাত সম্পর্কে আমাদের নবী (ﷺ) বলেছেন:
ركعتا الفجر خير من الدنيا وما فيها
"পৃথিবী ও পৃথিবীর মধ্যস্থল যা কিছু আছে, তারচিয়াত আরও বেশি ভাল ফজর দুই রাকাত (সুন্নাত) সালাত।" [মুসলিম, তিরমিযী, নাসাঈ, আহমাদ]
জায়নামাযে সাথে বসে বসে আরেকটি ভাবনার সৃষ্টি হোল আচ্ছা, ফজরের দুই রাকাত সুন্নাতের মূল্য যদি এত বেশি হয়, তবে ফরজ দুই রাকাত মূল্য এবং মর্যাদা কত বেশি হতে পারে!
আধা ঘন্টার বেশী ঘুমাওর জন্য আমি প্রতিদিন এত বড় সম্মান এবং সম্মানিত উপশমকে হারিয়ে ফেলেছি! কি বোকা আমি! আমাকে কি ধিক্কার দেবো? না, এটি দিয়ে লাভ নেই। বরং তারা দেরি না করে সৌভাগ্যবানদের কাতারে নিজেকে শামিল করে ফেলতে স্থিরী হয়ে যাক.
এরপর থেকে আমি ফজরের সালাতে মনোনিবেশ করতে চেষ্টা করলাম বিছানা পেলবতা আমাকে আর পুরানো গর্তে ফেলতে পারে না 'আসসালাতু খাইরুম মিনান নাওম' আমার কণ্ঠে অশিক্ষিত সুরের অদ্ভুত লাগে। কি এক তন্ময়তার ঘোড়া আমাকে পেয়েছেন! আমি ধীর পদক্ষেপে মাসজিদ এর দিকে পা বাড়াই পৃথিবীর কোল থেকে রাত্রি তখনও পুরোপুরি না আবদ্ধ অন্ধকারের বুক চিরে আমার কদম অগ্রসর হয়। কেমন একটা তৃপ্তির রেশ আমার 'সুতি-মগন' আলতু ছোঁয়ায়ে জগাতে থাকে। এই তৃপ্তিবিবেলের উত্স কোথায়? উৎস তাই অনেক! তুমি কি বল? একটি উৎস হতে পারে এই হাদিস:
من صلى العشاء في جماعة فكأنما قام نصف الليل ومن صلى الصبح في جماعة فكأنما قام الليل كله
"জামা'আত সহকারে যে 'ইশায় আদায় করলো, সে হ'ল আব্দরাত্রিের কাছে (নফল) সালাত আদায় করত; এবং জামা'আত সহকারে যে ফজর আদায় করতেন, তিনি সারা রাত ধরে (নফল) সালাত আদায় করতেন। "[সাহীহ মুসলিম, মুসনাদ আহমাদ]
গতকাল জামা'আত সঙ্গে 'ইশার সালাদ ইদানীং, আলহামদুলিল্লাহ। ফজরতাও জামা'আত সঙ্গে আদায় করতে যাচ্ছি। আল্লাহর ইচ্ছানুসারে আমার হিসেব খাতায় সারা রাত নফল সালাত আদায় সাওয়াব যোগ করা হচ্ছে, আমি তৃপ্ত হবো না কে কে? শয়তানের এতদিন আমার সাওয়াব নদী আড়ম্বরপূর্ণ বালুচুরের উদ্ভব ঘটেছে, আর আজকে আমি তার বালুচরে বিশ্বাসের ঢেউ নিয়ে এসেছি, আমি উদ্বেল হবো না কে কে?
এই তৃপ্তবিভের ঘোড়া নাট্য আরও কিছু জায়গা আছে। যেমন:
من صلى البردين دخل الجنة
এই হাদিসটা খুব চমৎকার! যদি এটিকে বাস্তবভাবে অনুবাদ করা হয়, তাহলে অর্থ দাঁড়াবে: "যে ব্যক্তি দু'টি শীতল সালাত আদায় করে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।" [বুখারী, মুসলিম, ইবন হিব্বান, দারমী, আহমাদ]
'দুইটি শীতল সালাত' বলতে এখানে কি বোঝানো হয়েছে, সে সম্পর্কে সকল স্কলার একমত: আসর সালাত এবং ফজর সালাত এই দুটি শব্দে প্রকৃতি তুলনামূলক স্নিগ্ধ এবং শীতল থাকে।
এই হাদিস স্নিগ্ধতা যখন আমি স্পর্শ করেছি, হাদিসের মর্মবাণী যখন আমার মর্মমূলে শীতলতার অঙ্কুরোদগম ঘটেছিল, তখন আমার মত প্রশান্তি, আমার মত নির্বিশেষে আর কেউ না।
এরকম আরেকটি ছোট হাদিস আছে, আমার চোখেমুতে প্রশান্তি ঝুঁকি এনে দেয়:
لن يلج النار من صلى قبل طلوع الشمس وقبل غروبها
"যে কেউ জাহান্নামে প্রবেশ করবে না কখনও, যে সূর্য উঠতে এবং সূর্য ডোবার আগে আগে প্রার্থনা করা হবে।"
[মুসলিম, নাসাঈ, তাবারানী, ইবনে হিব্বান, ইবনে খুজাইমহ]
এতদিন নিজেকে নিয়ে হীনমনেতার ডালপালা শুরু করে মনের গাছপালা, এই হাদিসগুলিকে যেহেতু ছেলেরা চুরি করে আবার বৃক্ষের দাঁড় করানো আমার ভেতরে, যে বৃক্ষের ছায়ায় আমার ক্লান্ত বন দখিনা হাওয়ার পসারম মেক, যার শাখা-প্রশাখা ফিরদাউস পাখিরা এসে গান ধরে। আমি শনি এবং আন্দোলিত হই আমি দেখি এবং উত্তেজিত
কিন্তু এতটুকু পথ চলাচলে এসে সন্নিবেশের জায়গাটি নিজেই গ্রহণ করে, কিন্তু তা না। আমাকে কতটা পেছটান হয়ে দমিয়ে রাখা চাইছে! যখন শয়তান দেখল, আমাকে কোন কারণে ফজর থেকে বিরত করা যায় না, তখন আমার রুমের মধ্যে ব্যস্ততা ডলি নিয়ে আসার জন্য হাজির হোল। উদ্দেশ্য, আমি যেমন অনেক রাতে ঘুমাই, এবং ফজরে যে কোনও ক্রমবর্ধমান, সম্পূর্ণ মনোনিবেশ সঙ্গে সঙ্গে ফজর আদায় না করতে পারি। আমি তার এই ফন্ডি প্রথম না বুঝতে অনেক রাতে পর্যন্ত জাগী ভাবলাম, অ্যালার্ম ক্লক আছে, আমিও আল্লাহকে বিশ্বাস রাখি, মাসজিদও বলতেন আযান থেকে শোনা যায়, অতএব জাগগ্রত হওয়া সম্পর্কে আমার কোনও দুশ্চিন্তা নেই। প্রকৃতপক্ষে জাগ্রত হওয়া সম্পর্কে আমার কোন সমস্যা নেই কিন্তু ক্ষতি যে জায়গায় ঘটেছে, তা হোল, আমি পূর্ণ হক আদায় করে ফজরে শামিল হতে পারছি না। সালাত দাঁড়ালে চোখের পাতা লেগে যেতে চায়, ইমামের কায়আআত মনোযোগ সহকারে শোনা যায় ক্রমশ কমে আসেন, কেউ সালাত শেষ হলে বিছানায় আসেন না। কিন্তু শায়তান আর কতদিন পার হয়ে যাবে? চোর দশদিন, গৃহস্থের একদিন আমি ঠিক ছিল হাতেনা ধরে ফেললাম তার ফাঁদে আমাকে কোরআন স্মরণ করে দাও:
وإذا قاموا إلى الصلاة قاموا كسالى
"এবং তারা যখন সালাতা দাঁড়ায়, তখন আলসেমীর সাথে দাঁড়ায়" [সূরা আন-নিসা: 14২]
সারে সববনাশ! এই রুকূর আয়াতগুলোতে মুনাফিকদের চরিত্র বর্ণিত হয়েছে! তবে কি আমি তাদের একজন হয়ে যাব? এদ্দিনে তাদের কাতারে ছিলাম ফজর ত্যাগ করার মাধ্যমে এখন দেখছি ফজর আদায় করেও তাদের এক হয়ে যাচ্ছে! কারণটা কি? কারণটা কিছু না, আমি পূর্ণ মনোনিবেশ এবং যথাযথ আন্তরিকতার সাথে সালাত দাঁড়াতে না।
কিন্তু এই অভ্যাস ছাড় ছাড়াই দেরি হয়। আজকে আজকের দিন, এতো কালকেই চলে যায় ... এভাবে করার জন্য আমার আর রাত জাগা বন্ধ হয়ে গেছে। এই চিন্তার আলস্যকে এক ঘা দ্বারা বিদায় না করা হলে বিপদ! আল্লাহ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহাবী ক'ব ইবনে মালিক (রঃ) এভাবেই পিছনে পড়ে গিয়েছিলেন একবার! তাবুক যুদ্ধে সৈন্যবাহিনী সাথে তিনি বেরো না নি দেরি করিয়ে এখন না, একটু পরে আজকে নয়, কালকে সৈন্যবাহিনীতে ধীরগতিয়ে আগাছী, আর আমি তাগ্রে যুবক, সঙ্গে আছে তেজী ঘোড়া, কাজেই, যখনই বের হও, আমি তাদের সাথে মিলিত হবো। তারপর কী হোল? একদিন গেলো, দুইদিন, তিনদিন, চারদিন ... সৈন্যবাহিনী অনেক দূরে চলে গেল, তারও যুদ্ধে যেতে গিয়ে হোল না। ফলাফল? আল্লাহ ও তাঁর রসূল (ﷺ) অসন্তুষ্টি। এই ঘটনা আমাকে দোষী সাব্যস্ত করেছে, 'ফৈজ! যা করার আজ থেকে শুরু কোর! কালকে করলো দেরি করার অর্থই হচ্ছে অনিশ্চিততার দিকে নিজেকে ঠেলে দাও। '
তারপর থেকে আমি ডিটারমাইন্ড সেদিন থেকে আর কখনও রাত্রে জাগি না। ছোটবেলায় ইশকুল পড়া 'আর্লি টু বেড অ্যান্ড আর্লি টু রাইজ / মেইক এ মেন হেলডি অ্যান্ড ওয়াইজ' ছড়া খুব মনে পড়ছে। পরিমিত ঘুম হয়, এটা সময় হুবেব ঘুমিয়ে জেএ। আয়াতুল কুরসী তো মায়ের কোল থেকে পাঠাচ্ছে, এখনো বাদ যায় না সূরা ফালাক ও নাস পড়, হাত দ্বারা গায়ে ফারাশ বুলিয়ে ডান কাত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ি আল্লাহ নাম। মুয়াজ্জিনের আযান সঙ্গে সঙ্গে আবার জাগী ধীরেসুথে অযু কর সময় হলে দুই রাকাত সুন্নাত বাড়িতে থেকে আদায় করা মাসজিদের জন্য রওনা হ'ল খোলা বাতাসে আমার কন্থ খল্লা মায়ের কাছে শেখা সূরাগুলো বিড়বিড় করে আওরাতে থাকি। পবিত্রতা আবেশ ঢাকায় অনুভূতি আর জীবন অর্থ খুঁজে পাওয়ার আনন্দ মিলে আমার ভেতরে মিশ্র প্রতিক্রিয়া জন্ম দেয়। নিজের অর্জিত পাপসমূহের কথা ভেবেই চোখ দুটো ছলছল হয়ে ওঠে মাঝে মাঝে তবুও বিশ্বস পাই, এমন জায়গায় নিজেকে আত্মসমর্পণ করতে, শত অপরাধ সত্ত্বেও যারা বান্দাহকে টেনে এনেছিল। ভোরের পাখিরা ঘুম পাড়া জাগাতে শুরু করে। কখনও মনে হয়, আমার খোঁচানো কণ্ঠের সাথে তারাও একত্রীকরণ চাইছেন গলির মোর্চা ইলেকট্রিকের খাম্বায়ে দুইটি শালিক-সাদৃশ্য পাখি হঠাৎ নজরে পড়া। আমি তাদের তাকান, আমার বন্ধু নাভির ছড়াটা মনের ভেতরে নতুন কোনো দ্যততার সৃষ্টি করে:
"বুকের খাতায় খুব জিতনে / একটি স্বপন আঁকা
ফিরদাউস ফুল বাগানে / আমি হাব পাখি। "
আমি পথ চলতে থাকুন মাসজিদদের কাছে এসে শেষ হয়ে গেছে ভুল দেখানো হচ্ছে, এই পথটি শেষ এখানে নয়। এই পথ ফিরদাউসের সোনারী তোরনদ্বার পর্যন্ত প্রসারিত আমি যে পথেই হাঁটছি তুমি কি আমার সাথে?
Comments
Post a Comment